মদনে যৌ'ন ব্যবসার ‘সাম্রাজ্য’ গড়ার অভিযোগ চার ভাইয়ের বিরুদ্ধে, প্রধান ইন্ধনদাতা বোনজামাই সৈয়দ রাসেল
ভাটাপাড়ায় প্রভাব বিস্তার ও মসজিদকেন্দ্রিক বিরোধের অভিযোগ; মদনে বোনজামাইয়ের মদদে যৌ'ন ব্যবসার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার দাবি স্থানীয়দের
স্টাফ রিপোর্টার, সুনামগঞ্জ
সুনামগঞ্জের ভাটাপাড়া গ্রামের একই পরিবারের চার ভাইকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগের কথা জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ। এলাকায় প্রভাব বিস্তার, সাধারণ মানুষের সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদ, সামাজিক বিভিন্ন বিষয়ে আধিপত্য দেখানোর চেষ্টা এবং মসজিদকেন্দ্রিক বিরোধে জড়ানোর অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। তবে এসব অভিযোগের চেয়েও গুরুতর যে অভিযোগটি সামনে এসেছে, সেটি ভাটাপাড়া নয়—মদন এলাকাকে কেন্দ্র করে।
স্থানীয়দের দাবি, চার ভাইয়ের বড় বোনের স্বামী সৈয়দ রাসেলের মদদ, ইন্ধন ও নিয়ন্ত্রণে মদন এলাকায় যৌ'ন ব্যবসার একটি নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে। অভিযোগকারীরা সৈয়দ রাসেলকে এই কর্মকাণ্ডের প্রধান ইন্ধনদাতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বোনজামাইয়ের আশ্রয় ও সহযোগিতায় চার ভাই মদনে নিয়মিত যাতায়াত শুরু করেন এবং একপর্যায়ে সেখানে যৌ'ন ব্যবসাসংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন।
অভিযোগ ওঠা চার ভাই হলেন ভাটাপাড়া গ্রামের মোহাম্মদ খালেকের ছেলে আল আমিন টিটন, মস্তাকিম টিপু, মো. মুক্তাসির তারেক ও মুফাসসির।
সাধারণ জীবন থেকে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, চার ভাইয়ের পরিবার একসময় সাধারণ জীবনযাপন করত। পরিবারের সদস্যরা কৃষিকাজের পাশাপাশি ডেকোরেটরের কাজের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। গ্রামবাসীর দাবি, পরবর্তী সময়ে চার ভাই এলাকায় নিজেদের প্রভাবশালী হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা শুরু করেন।
অভিযোগকারীরা জানান, বিভিন্ন সামাজিক ও ব্যক্তিগত বিষয়ে অন্যদের ওপর প্রভাব খাটানো, মানুষের সঙ্গে দুর্ব্যবহার এবং ছোটখাটো বিষয় নিয়ে বিরোধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ ক্রমেই বাড়তে থাকে। স্থানীয়দের একটি অংশের দাবি, তাদের আচরণের কারণে গ্রামবাসীর সঙ্গে পরিবারের দূরত্বও ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো আদালতের রায় বা সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন এই প্রতিবেদকের হাতে নেই। ফলে অভিযোগগুলো স্থানীয়দের ভাষ্য হিসেবেই উল্লেখ করা হচ্ছে।
মসজিদকেন্দ্রিক বিরোধ নিয়েও অভিযোগ
চার ভাইকে ঘিরে শুধু ব্যক্তিগত বা সামাজিক বিরোধই নয়, এলাকার মসজিদকেন্দ্রিক বিষয় নিয়েও বিরোধের অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
গ্রামবাসীর একাংশের দাবি, মসজিদের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রমে নিজেদের প্রভাব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতেন পরিবারের সদস্যরা। বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার স্থানীয় মুসল্লিদের সঙ্গে মতবিরোধ ও উত্তেজনা তৈরি হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে সামাজিক ও ধর্মীয় বিরোধ এতটাই তীব্র হয় যে তারা গ্রামের অন্য মুসল্লিদের থেকে আলাদাভাবে নামাজ আদায় করতেন। গ্রামবাসীরা বিষয়টিকে এলাকায় তৈরি হওয়া দীর্ঘদিনের সামাজিক দূরত্বের একটি উদাহরণ হিসেবেও তুলে ধরেছেন।
তবে মসজিদ কমিটির দায়িত্বশীল ব্যক্তি কিংবা অন্য কোনো নিরপেক্ষ সূত্রের মাধ্যমে এ অভিযোগ স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
মদনেই গুরুতর অভিযোগের সূত্রপাত
স্থানীয়রা পরিষ্কার করে জানিয়েছেন, ভাটাপাড়া এলাকায় চার ভাইয়ের বিরুদ্ধে যৌ'ন ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ নেই। বরং এ ধরনের গুরুতর অভিযোগের কেন্দ্র মদন এলাকা।
চার ভাইয়ের বড় বোনের স্বামী সৈয়দ রাসেলের বাড়ি মদনে। অভিযোগকারীদের দাবি, বড় বোনের বিয়ের সূত্রে চার ভাইয়ের সঙ্গে সৈয়দ রাসেলের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ তৈরি হয়। এরপর ধীরে ধীরে তারা মদনে যাতায়াত শুরু করেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সৈয়দ রাসেলের ইন্ধনেই চার ভাই এমন কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন এবং পরবর্তী সময়ে মদনে যৌ'ন ব্যবসার একটি নেটওয়ার্ক তৈরি হয়। অভিযোগকারীদের কেউ কেউ এটিকে যৌ'ন ব্যবসার ‘সাম্রাজ্য’ বা পতিতালয়সদৃশ কার্যক্রম হিসেবেও বর্ণনা করেছেন।
প্রধান ইন্ধনদাতা হিসেবে সৈয়দ রাসেলের নাম
স্থানীয় অভিযোগের একটি বড় অংশজুড়েই রয়েছে বোনজামাই সৈয়দ রাসেলের নাম।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি শুধু পরিচয় করিয়ে দেওয়া বা উৎসাহ দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; বরং চার ভাইকে মদনে নিয়ে যাওয়া, তাদের সেখানে আশ্রয় দেওয়া এবং এসব কর্মকাণ্ড পরিচালনায় সহযোগিতা করার ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা ছিল।
এ কারণেই স্থানীয়দের একাংশ সৈয়দ রাসেলকে পুরো কর্মকাণ্ডের ‘প্রধান ইন্ধনদাতা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তাদের দাবি, সৈয়দ রাসেলের প্রভাব ও সহযোগিতা না থাকলে চার ভাইয়ের পক্ষে মদনে এমন কার্যক্রম পরিচালনা করা সহজ হতো না।
তবে সৈয়দ রাসেলের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো পুলিশি তদন্ত প্রতিবেদন, মামলা, আদালতের রায় বা সরকারি নথি এই প্রতিবেদন তৈরির সময় পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও অভিযোগ
চার ভাই এবং তাদের বোনজামাই সৈয়দ রাসেলের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে নানা দাবি রয়েছে।
স্থানীয়দের একাংশের দাবি, সৈয়দ রাসেল একসময় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। একইভাবে চার ভাইয়েরও অতীতে আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠ অবস্থান ছিল বলে অভিযোগকারীদের কেউ কেউ দাবি করেছেন।
পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তারা বিএনপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরির চেষ্টা করেন বলেও স্থানীয়দের অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয়, দলীয় পদ-পদবি বা সাংগঠনিক সংশ্লিষ্টতার পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য দলীয় নথি বা দায়িত্বশীল রাজনৈতিক সূত্রের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাই রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার বিষয়টিও স্থানীয়দের অভিযোগ হিসেবেই উল্লেখ করা হচ্ছে।
গ্রামবাসীর সঙ্গে বাড়তে থাকে দূরত্ব
গ্রামবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে নানা বিরোধে জড়িয়ে পড়ায় চার ভাইয়ের সঙ্গে স্থানীয়দের একটি বড় অংশের সামাজিক দূরত্ব তৈরি হয়।
কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, পরিবারের সদস্যরা নিজেদের প্রভাবশালী মনে করতেন এবং গ্রামের অন্যদের মতামতকে গুরুত্ব দিতে চাইতেন না। সামাজিক বিভিন্ন সিদ্ধান্ত, পারিবারিক বিরোধ কিংবা ধর্মীয় বিষয় নিয়েও তাদের সঙ্গে গ্রামের মানুষের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এসব ঘটনা ধীরে ধীরে গ্রামবাসীর মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি করে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের কয়েকজন বলেন, তারা দীর্ঘদিন ধরে বিষয়গুলো নিয়ে অস্বস্তিতে থাকলেও প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পাননি। এখন তারা চান, অতীত ও বর্তমান সব অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক।
‘অভিযোগ সত্য হলে সামাজিকভাবে ভয়াবহ’
স্থানীয়দের মতে, মদনে যৌ'ন ব্যবসাসংশ্লিষ্ট যে অভিযোগ উঠেছে, সেটি সত্য হলে এটি শুধু একটি পরিবারের বিষয় নয়; বরং বৃহত্তর সামাজিক উদ্বেগের বিষয়।
তাদের বক্তব্য, এ ধরনের কর্মকাণ্ড সমাজের তরুণ প্রজন্মের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবং এলাকার সামাজিক পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
গ্রামবাসীর একাংশ অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্তের পাশাপাশি মদনে বাস্তবে কী ধরনের কর্মকাণ্ড চলত, কারা এর সঙ্গে যুক্ত এবং কোনো সংঘবদ্ধ চক্র আছে কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন।
সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা চান এলাকাবাসী
স্থানীয়দের দাবি, ব্যক্তিগত শত্রুতা বা রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়, নিরপেক্ষভাবে পুরো বিষয়টি তদন্ত করা উচিত।
তারা চান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ভাটাপাড়ায় চার ভাইয়ের বিরুদ্ধে ওঠা প্রভাব বিস্তার, সামাজিক বিরোধ ও মসজিদকেন্দ্রিক অভিযোগ যেমন যাচাই করবে, তেমনি মদনে যৌ'ন ব্যবসা পরিচালনার গুরুতর অভিযোগও পৃথকভাবে তদন্ত করবে।
অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে চার ভাই এবং তাদের বোনজামাই সৈয়দ রাসেলসহ জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা না পাওয়া গেলে সেটিও জনসমক্ষে পরিষ্কার করার দাবি রয়েছে, যাতে কোনো নির্দোষ ব্যক্তি অন্যায়ভাবে হয়রানি বা সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হন।
অভিযুক্তদের বক্তব্য জরুরি
এই প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলো গুরুতর এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সামাজিক মর্যাদা ও সুনামের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই আল আমিন টিটন, মস্তাকিম টিপু, মো. মুক্তাসির তারেক, মুফাসসির এবং তাদের বোনজামাই সৈয়দ রাসেলের বক্তব্য নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে ভাটাপাড়া এলাকার মসজিদ কমিটি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, মদন ও সংশ্লিষ্ট এলাকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বক্তব্য পাওয়া গেলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত সত্যতা আরও স্পষ্ট হবে।
এই প্রতিবেদন তৈরির সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।

